* তাদের ভাবনায় প্রতীক নয়, প্রার্থীই মূল বিবেচনা
* নির্বাচন নিয়ে তরুণদের এই আগ্রহ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র
* ক্ষমতায়নে নারী ভোটারদের মধ্যেও বদলেছে হিসাব
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই হিসেবে নির্বাচনের বাকী আছে আর মাত্র ২৮দিন। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর ভোট উৎসবে মেতে উঠে দেশের মানুষ। তবে গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেই উৎসবে ভাটা পড়েছিল। অনেকেই ভোট দিতে কেন্দ্রে পর্যন্ত যাওয়ার সাহস পায়নি এবং যায়নি। এবার উৎসবমুখর পরিবেশে দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তবে নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন নতুন এবং তরুণ বয়সের ভোটাররা। এরইমধ্যে ভোট নিয়ে তাদের মধ্যে একধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।
জানা গেছে, গ্রাম-গঞ্জ থেকে শহর সবত্রই বইছে ত্রয়োদশ নির্বাচনি হাওয়া। নিজ নিজ সংসদীয় আসনে যোগ্য প্রতিনিধি বাছাইয়ের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ততম সময় পার করছেন সব বয়সী ভোটাররা। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি এবার সমানতালে সক্রিয় তরুণ ভোটাররাও। ঘরে-বাইরে, ক্যাম্পাসে, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সৎ-আর্দশবান প্রার্থীদের পক্ষে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন তরুন-তরুন ভোটাররা। শুধু তাই নয়, ত্রয়োদশ নির্বাচন নিয়ে দেশের পাড়া-মহল্লাসহ সর্বত্রই চলছে ভোটপূর্ব আলোচনা। সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের প্রথম ভোট গুরুত্বপূর্ণ হবে, এমন প্রত্যাশা তরুণদের। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন ভোটারদের ভাবনায় এসেছে কি কোনো পরিবর্তন, সে প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচনায়। গ্রামের মেঠোপথে রাস্তার ধারে কিংবাপ হাট-বাজারের চায়ের আড্ডায় কিংবা ক্যাম্পাসের করিডোর, তরুণদের আড্ডায় সর্বত্রই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় উঠে আসছে ‘ত্রয়োদশ নির্বাচন’। দল-মত, প্রতীক নাকি ব্যক্তির যোগ্যতা, কোনটি প্রাধান্য পাবে এবারের ভোটে, মূলত এ নিয়েই চলছে যুক্তিতর্ক। কথা হয় নতুন ভোটার আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাওয়াদ এর সঙ্গে। তিনি চান উৎসবমুখর পরিবেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তিনি বলেন, এবার যেহেতু একটা ভোটিং কালচার আমরা পাচ্ছি, আমি মনে করি তরুণদের এখানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়া উচিত। একজন নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রত্যেকের দায়িত্ব।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণদের আগ্রহ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এক ক্যাম্পাস থেকে আরেক ক্যাম্পাসে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। আলোচনা, বিতর্ক, বিশ্লেষণে সরব তরুণ প্রজন্ম। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ফলই হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট। ২০২৪ সালের সেই গণআন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণরাই, যাদের বড় একটি অংশ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তাই এবারের নির্বাচন ঘিরে তরুণদের মধ্যে রয়েছে আগ্রহ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রত্যাশা ও হতাশার মিশ্র অনুভূতি। জুলাই মুভমেন্টের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি তরুণ প্রজন্মের যে প্রত্যাশা ছিল, অনেক ক্ষেত্রেই তা পূরণ হয়নি, এমনটাই ভাষ্য এক তরুণীর। তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তরুণদের ম্যান্ডেট বোঝা এবং সেই অনুযায়ী রাজনীতি করা। একই সঙ্গে তরুণ প্রার্থীদের কাছেও রয়েছে বাড়তি প্রত্যাশার কথা উঠেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘জেন-জি’ প্রজন্ম রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন, এ কারণে তাদের সিদ্ধান্ত এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা তাদের।
ক্ষমতায়নে ত্রয়োদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারী ভোটারদের মধ্যেও বদলেছে নানা হিসাব। সরকার আসে-যায়, আশ্বাসবাণী শোনা যায়; কিন্তু নারী ক্ষমতায়নের বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং নারীদের হয়রানির ঘটনাও তরুণীদের ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলছে। তারা বলছেন, দল নয়, প্রার্থী দেখেই এবার ভোট দেবেন। নারী ক্ষমতায়নে যাদের বাস্তব ভূমিকা আছে, তাদের প্রতিই সমর্থন থাকবে। তবে নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি নাগাদ দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা হবে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬; যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ এই বিশাল তরুণ ভোটার অংশই নির্ধারণ করতে পারে নির্বাচনের ফলাফল। কথা হয় ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা এর সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশে নারী ভোটারের সংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি। তিনি বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে গত ৩৫ বছরে সরকারের সর্বোচ্চ পদ প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিক নারী। অথচ দেশের রাজনীতিতে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়া নারীদের সংখ্যা এখনো হাতেগোনা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, ৬ কোটি নারী ভোটার একটি বিশাল সংখ্যা। তারা যদি যথেষ্ট উৎসাহী না হন ভোট দিতে, তাহলে ভোটার উপস্থিতির হার কমে যাবে; যা গণতন্ত্রের জন্য ভালো বার্তা নয়। এর সঙ্গে গণভোটও আছে, তাই সবারই আগ্রহ থাকা উচিত ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তৈরি হবে তরুণদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের বড় অংশ। তবে সমাজ বিশ্লেষক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, বাংলাদেশই শুধু নয়, সারা পৃথিবী এখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এমন প্রার্থীকে খুঁজছেন, যিনি নতুন চিন্তা, নতুন সম্ভাবনা সামনে আনতে পারবেন। সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন তরুণদের জন্য শুধু ভোট দেয়ার সুযোগ নয়; বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
নারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ার পরও রাজনীতির মূল মঞ্চে তাদের এই নগণ্য উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কঙ্কালসার চেহারাটিকেই উন্মোচিত করছে। তাদের মতে, পেশীশক্তি ও অর্থবলে পিছিয়ে থাকা, ধর্মীয়-সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, নারীদের রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রধান বাধা। তাছাড়া পারিবারিক, সামাজিক কারণে এবং উচ্চ শিক্ষায় নারীর হার কম হওয়াও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাদের মতে, এবারের নির্বাচনে তরুণরা দল বা প্রতীক নয়; প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়, কাজ ও অবস্থান দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা মনে করছেন, তরুণদের ভোট পেতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন প্রচারণা এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শাসসুল আলম বলেন, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণে পিছিয়ে পড়ার পেছনে উচ্চশিক্ষার হার কম ও ধর্মীয় পশ্চাৎপদ প্রথা দায়ী। নারীরা বাড়িতে কাজ করবে তারা রাজনীতি কেন করবে? এমন প্রশ্ন তুলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারও। আবার দেখা যায় ইউনিয়ন পরিষদে নারী নির্বাচিত হলেও পুরুষ সহকর্মীরা তাকে জায়গা দিচ্ছে না, বরাদ্দ কম দিচ্ছে। অনেক সময় নিপীড়নও করে। এখানে চলে পেশিশক্তির ব্যবহার। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোরও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে নারীদের এগিয়ে নেয়া খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে সবারই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
নির্বাচনী হাওয়ায় ভাসছে দেশ
- আপলোড সময় : ১৫-০১-২০২৬ ০৬:২২:২৬ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৫-০১-২০২৬ ০৬:২২:২৬ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সফিকুল ইসলাম